যুক্তরাষ্ট্রফেরত জাহিদুল এখন সফল কৃষি উদ্যোক্তা
যুক্তরাষ্ট্রফেরত জাহিদুল এখন সফল কৃষি উদ্যোক্তা
প্রায় দেড় যুগ যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়ে দেশে ফিরে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মো. জাহিদুল ইসলাম। ভেজালমুক্ত ফসলের চিন্তা থেকেই তাঁর উদ্যোগের শুরু, যা পরে বাণিজ্যিক রূপ নেয়। পদ্মার চরে প্রায় ১০০ বিঘা জমি কিনে চাষাবাদ শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তাঁর কৃষি খামারে ২০ ধরনের ফসল উৎপাদিত হচ্ছে এবং তৈরি হচ্ছে শতাধিক পণ্য। জাহিদুল ইসলামের জন্ম রাজবাড়ীর পাংশায়। সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে। সেনাবাহিনীতে যোগদানের স্বপ্ন ছিল তাঁর। উচ্চমাধ্যমিক শেষে ১৯৮২ সালে সেই সুযোগও পান। কিন্তু প্রশিক্ষণকালেই পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ায় বাদ পড়েন। পরে পরিবারের ইচ্ছায় মেডিকেলে ভর্তি হলেও সেখানে বেশি দিন মন টেকেনি। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশোনা শেষে ঠিকাদারি ও আমদানি ব্যবসায় যুক্ত হলেও অভিজ্ঞতার অভাবে সাফল্য পাননি। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে। ১৯৯০ সালে এমবিএ শেষ করে বেসরকারি একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে প্রকল্পপ্রধান হিসেবে যোগ দেন। আড়াই বছর চাকরি শেষে ১৯৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখানে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কিছু কোর্স করেন এবং একটি ই-কমার্স ওয়েবসাইট চালু করে ব্যবসা শুরু করেন। প্রায় ২০ বছর পর, ২০১২ সালে দেশে ফেরেন। দেশে ফিরে এক স্থপতি বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে নির্মাণ খাতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান শুরু করেন। এর মধ্যেই উদ্যোক্তা হওয়ার ভাবনা জাগে। ঢাকায় পাওয়া ফসলের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকায় পরিবারের জন্য ভেজালমুক্ত ফসল জোগাড় করতে রাজবাড়ীর পৈতৃক ভিটায় কৃষিকাজ শুরু করেন। ২০১৪ সালে ডাল, গম, শর্ষে ও সবজি চাষ করেন এবং ভালো ফলনে উৎসাহ পান। পরে ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কৃষিপণ্যের প্রতিষ্ঠান ‘কোলে-কাপরা’। বড় পরিসরে ফসল উৎপাদনের জন্য জমির খোঁজে ছিলেন। পরে পাবনা ও কুষ্টিয়া সীমান্তে পদ্মার কোল ঘেঁষে অনাবাদি জমি দেখে প্রায় ১০০ বিঘা জমি কেনেন। প্রাথমিক বিনিয়োগ করেন প্রায় ৬০ লাখ টাকা। পরে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) থেকে ঋণ নেন। জমি কিনে, প্রস্তুত করে, ফার্ম ও প্রসেসিং ইউনিট স্থাপনসহ কৃষিকাজে এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ১২ জন ও মৌসুমি ভিত্তিতে ২৫ জন কর্মী কাজ করেন। প্রতিবছর গড়ে ২০-২৫ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করে ‘কোলে-কাপরা’। উৎপাদিত ফসল ও পণ্য জাহিদুলের খামারে আখ, ধান, গম, ডাল, যব, ঢেমশি (বাকহুইট), ওটস, চিয়া সিড, তিশি, তিল, মেথি, কালিজিরা, শর্ষে, ধনিয়া, পেঁয়াজ, রসুনসহ নানা ফসল উৎপাদিত হয়। তিনি মসুর, মটর, মাষকলাই, অড়হর, মুগ, হেলেন ডালও চাষ করেন। ধান থেকে চাল, গম থেকে আটা ও আখ থেকে গুড়সহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদন করেন তিনটি নিজস্ব প্রসেসিং ইউনিটে। তাঁর ফার্মে উৎপাদিত হয় ঔষধি গুণসম্পন্ন বিভিন্ন ফুল ও পাতাও—যেমন অপরাজিতা, রোজেলা টি, জবা, কারি, নিম, তুলসী, শজনে ও পেঁপে পাতা। ‘কোলে-কাপরা’র পণ্যের প্রধান ক্রেতা ঢাকাকেন্দ্রিক হলেও চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকেও ভালো সাড়া পাওয়া যায়। ব্যক্তি ও পাইকারি—উভয় ধরনের ক্রেতাই রয়েছেন। সারা দেশে কুরিয়ার মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ করা হয়। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে অনেক অর্ডার আসে। বিক্রয় ও বিপণনের দায়িত্বে আছেন তাঁর স্ত্রী জুলিয়া ইয়াসমীন। ঢাকার বনানীতে প্রতিষ্ঠানটির একটি নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্রও রয়েছে। জাহিদুলের লক্ষ্য হচ্ছে ইকোসিস্টেম রক্ষা করে টেকসই কৃষিকাজ করা। এজন্য রাসায়নিকের পরিবর্তে প্রাকৃতিক বালাইনাশক ব্যবহার করেন। উদাহরণস্বরূপ, ফসলের পোকা দূর করতে তিনি ১১ ধরনের তিতা পাতার মিশ্রণ তৈরি করে ব্যবহার করেন। চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তাঁর কিছু জমি নদীভাঙনে হারিয়ে গেছে, আবার কিছু দখল করেছেন স্থানীয় দুর্বৃত্তরা। ভবিষ্যতে পশুসম্পদ, মৎস্য ও পোলট্রি খাতেও ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। জাহিদুলের মতে, ‘আমাদের দেশের জন্য ইকো-সাসটেইনেবল কৃষিকাজ খুবই জরুরি। এ জন্য বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন নেই। সরকার যদি আমাদের মতো উদ্যোক্তাদের নীতি সহায়তা ও নিরাপত্তা দেয়, তবে কমিউনিটি ভিত্তিতে কৃষির এ মডেল ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।’ #AgricultureTV #কৃষি_সংবাদ #বেগুন_চাষ #কৃষি_উদ্যোক্তা #জৈব_চাষ #কৃষক_কথা #বাংলার_কৃষি #ফসল_উৎপাদন #ভেজালমুক্ত_খাদ্য #সফল_কৃষক #কৃষি_প্রযুক্তি #স্মার্ট_কৃষি

কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন