যেভাবে জন্ম নেয় আমের নতুন জাত: বৈচিত্র্য ও উদ্ভাবনের গল্প!
যেভাবে জন্ম নেয় আমের নতুন জাত: বৈচিত্র্য ও উদ্ভাবনের গল্প!
বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে আমের প্রায় ৮০০টি ভিন্ন জাত, যার অধিকাংশই স্থানীয়। এই বিশাল বৈচিত্র্যের মধ্যেও প্রতিটি জাতের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে: কোনটি মিষ্টি কিন্তু সুগন্ধ নেই, কোনটি আকারে ছোট হলেও সুঘ্রাণযুক্ত, আবার কোনোটির আঁটি বড় হলেও আঁশ কম। এক আমের মধ্যে একাধিক ভালো বৈশিষ্ট্যকে একত্রিত করে নতুন ও উন্নত জাত তৈরির তাগিদ থেকেই শুরু হয়েছে আমের উপর নিবিড় গবেষণা।
এই গবেষণার ধারাবাহিক সাফল্যে বাংলাদেশের বাজারে এখন পাওয়া যায় নতুন ১৮টি উদ্ভাবিত আমের জাত। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) তিনটি হাইব্রিড জাত সহ মোট এই ১৮টি জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে ১৪টি জাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম গবেষণা কেন্দ্র থেকে এবং বাকি ৪টি রাজশাহী সহ অন্যান্য ফল গবেষণা কেন্দ্র থেকে অবমুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশে আম গবেষণার পথচলা: গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আমের নতুন জাত উদ্ভাবন নিয়ে কাজ শুরু হয় ১৯৯৩ সাল থেকে। এই উদ্ভাবনের জন্য মূলত চারটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়: হাইব্রিডাইজেশন (সংকরায়ণ), ইন্ট্রোডাকশন (পরিচিতি বা প্রবর্তন), সিলেকশন (বাছাই) এবং মিউটেশন (পরিবর্তন)।
- হাইব্রিডাইজেশন (সংকরায়ণ): এই পদ্ধতিতে চারটি নতুন জাত পাওয়া গেছে।
- ইন্ট্রোডিউস (পরিচিতি): এই পদ্ধতিতে দুটি নতুন জাত পাওয়া গেছে।
- সিলেকশন (বাছাই): এই পদ্ধতিতে ১২টি নতুন জাত পাওয়া গেছে।
- তবে, মিউটেশন পদ্ধতিতে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত নতুন জাতের কোনো আম উদ্ভাবন করা যায়নি।
আমের নতুন জাত উদ্ভাবনের প্রধান পদ্ধতিগুলো:
১. হাইব্রিডাইজেশন (কৃত্রিম সংকরায়ণ): এটি দুটি ভিন্ন গাছের উন্নত বৈশিষ্ট্যকে কৃত্রিম পরাগায়ণের মাধ্যমে একটিতে নিয়ে আসার পদ্ধতি। এর ফলে নতুন যে জাতটি জন্ম নেয়, তাতে উভয় parent (মা ও বাবা গাছ)-এর কাঙ্ক্ষিত গুণাবলি বিদ্যমান থাকে।
- উদাহরণ: আশ্বিনা আমের মা ফুলের (Female flower) সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার রঙিন জাতের একটি আমের বাবা ফুলের (Male flower) সংকরায়ণ ঘটানো হয়েছে। এই সংকরায়ণের ফলে প্রাপ্ত নতুন আমের জাতটির নাম রাখা হয়েছে বারি আম-৪। এই হাইব্রিড আমটি আশ্বিনার চেয়ে ওজনে, মিষ্টিতে, ফলনে এবং দেখতে অনেক উন্নত হয়েছে।
- একইভাবে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুস্বাদু গোপালভোগের সাথে বারি আম-১ এর সংকরায়ণে তৈরি হয়েছে বারি আম-১৮ জাতটি, যা রসালো ও সুঘ্রাণে ভরপুর।
- অন্যান্য উদাহরণ: বারি আম-৩ ও পালমার জাতের সংকরায়ণে হয়েছে বারি আম-১৩, এবং বারি আম-৩ ও বারি আম-৪–এর সংকরায়ণে পাওয়া গেছে বারি আম-১৭।
২. ইন্ট্রোডাকশন (পরিচিতি বা প্রবর্তন): এই পদ্ধতিতে বিদেশি কোনো উন্নত জাতের আমের চারা এ দেশে নিয়ে আসা হয়। এরপর কয়েক বছর ধরে নিবিড় পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সেটিকে বড় করা হয়। যদি সেটি বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পরিবেশে খাপ খাওয়াতে পারে এবং কাঙ্ক্ষিত ফলন দেয়, তাহলে সেটিকে আমের একটি নতুন জাত হিসেবে অবমুক্ত করা হয়।
- উদাহরণ: ভারত থেকে এ দেশে এসে সফলভাবে পরিচিতি লাভ করেছে বারি আম-৩, যা বর্তমানে আম্রপালি নামেই অধিক পরিচিত।
- এছাড়াও, সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে এনে পরিচিতি লাভ করেছে বারি আম-১৪।
৩. সিলেকশন (বাছাই): এই পদ্ধতিতে দেশী বা বিদেশি কোনো জাতের বিভিন্ন জেনোটাইপ (জিনগত প্রকারভেদ) বা জার্মপ্লাজম (বীজ বা বংশাণুসম্ভার) সংগ্রহ করা হয়। এরপর নিবিড় পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এদের মধ্য থেকে উন্নত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জেনোটাইপ বা জার্মপ্লাজমকে বাছাই করা হয়। বাছাইকৃত এই উন্নত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন লাইনটিকেই পরে নতুন জাত হিসেবে অবমুক্ত করা হয়।
- এই পদ্ধতিতে প্রাপ্ত জাতগুলো হলো: বারি আম-১, বারি আম-২, বারি আম-৫, বারি আম-৬, বারি আম-৭, বারি আম-৮, বারি আম-৯, বারি আম-১০, বারি আম-১১, বারি আম-১২, বারি আম-১৫ এবং বারি আম-১৬।
বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ: এই নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলোর স্বাদ ও ফলন ভালো হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে এর আবাদ বাড়ছে, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে একটি উদ্বেগের বিষয় হলো, বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক না হওয়ায় স্থানীয় জাতের কিছু আমগাছ কেটে ফেলার ঘটনা ঘটছে, যার ফলে ঐতিহ্যবাহী সেই স্থানীয় আমের জাতগুলো বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. জমির উদ্দিনের মতে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি আম নামে ১৮টি জাত অবমুক্ত করেছে যা মূলত বাণিজ্যিক চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখেই করা হয়েছে। তবে চাষিরা এখনো সব জাতের সাথে পরিচিত নন। তারা প্রধানত বারি-৩, বারি-৪ এবং বারি-১৩ নিয়েই বেশি আগ্রহী। চাষিদের মধ্যে অন্যান্য জাত সম্পর্কে পরিচিতি বাড়াতে এবং তাদের কাছে চারা বিতরণের মাধ্যমে এই জাতগুলোর প্রচার বাড়ানো গেলে চাষিরা আরও বেশি লাভবান হবেন এবং দেশও উপকৃত হবে।
#আমেরজাত #নতুনআম #আমগবেষণা #হাইব্রিডআম #বারিআম #কৃষিউদ্ভাবন #আম্রপালি #ফলন #বাণিজ্যিককৃষি #উদ্যানতত্ত্ব
এই বিষয়ে আপনাদের কী কী অভিজ্ঞতা বা অভিমত আছে, তা আমাদের সাথে শেয়ার করুন!
আমাদের Agriculture TV ফেসবুক পেজটি লাইক, কমেন্ট এবং শেয়ার করে আমাদের সাথেই থাকুন।
আলমগীর হোসেন শিশির, কৃষি উদ্যোক্তা। পরিচালক : Agriculture TV

কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন