বাবার লাশ দাফন করেই গরুর হাটে আরিফুল । জীবন বড় কঠিন।
বাবার লাশ দাফন করেই গরুর হাটে আরিফুল
এগ্রিকালচার টিভি নিউজ :
বাবার লাশ কাঁধে করে কবর দিয়ে এসেছেন মাত্র একদিন আগে। অথচ পরদিনই নবম শ্রেণির ছাত্র আরিফুল ইসলামকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল ঢাকার বছিলা গরুর হাটে, গরুর গলায় দড়ি ধরে। মুখে হাওয়ার মতো স্তব্ধতা, চোখে ভয়ের ঘূর্ণি। পাশে নেই কোহিনূর শেখ—তার বাবা, তার অভিভাবক, তার জীবনের চালক।
দেখলে কেউ বুঝবে না, ছেলেটি মাত্র গতকাল বাবার জানাজায় অংশ নিয়েছে। কিন্তু গরুগুলো তো বিক্রি করতেই হবে। টানাপোড়েনের সংসারে বাবার রেখে যাওয়া তিনটি গরুই এখন পরিবারের একমাত্র সম্বল।
গরুর সঙ্গে বাবা, সামনে বিদেশফেরত খালা
ঘটনা শুরু হয়েছিল ঈদের আগে। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার নীচপলাশী ফতেপুর গ্রামের কোহিনূর শেখ বাড়ি থেকে রওনা দিয়েছিলেন তিনটি গরু নিয়ে। ঢাকার বছিলা হাটে বিক্রি করবেন বলে। গরুগুলোর পেছনে ট্রাকে বসেছিলেন তিনি, আর সামনে চালকের পাশে ছিল ছেলে আরিফুল। পরিকল্পনা ছিল, ঢাকায় পৌঁছে গরু হাটে নামিয়ে কোহিনূর বাড়ি ফিরবেন। আর আরিফুল বিমানবন্দরে যাবেন খালাকে আনতে—যিনি বিদেশ থেকে ফিরছেন।
সঙ্গে নিয়েছিল নতুন জামাকাপড়ও।
কিন্তু সব পরিকল্পনা থেমে যায় একটি দুর্ঘটনার ধাক্কায়।
যমুনা সেতু পেরিয়ে না-ফেরা সকাল
৩১ মে দিবাগত রাত। কোহিনূর শেখ ফোন করেন মেয়ে আমেনাকে—“যমুনা সেতু পার হয়েছি মা, ফোনে টাকা নাই, সকালে দিও।”
সেই সকাল আর আসেনি।
রাত সোয়া একটার দিকে টাঙ্গাইলের দেওহাটা এলাকায় হঠাৎ করেই একটি সবজিবোঝাই ট্রাক এসে ধাক্কা দেয় তাঁদের গরুবোঝাই ট্রাকটিকে। ঘটনাস্থলেই মারা যান কোহিনূর শেখ। হাসপাতালে নেওয়ার পরও আর ফিরলেন না।
লাশ, কান্না ও দায়
ব্যবসায়ীদের হাতে গরু রেখে আরিফুল বাবার লাশ নিয়ে রাজশাহী ফিরে যায়। পরদিনই দাফন শেষে আবার ঢাকায়। মাথার উপর ছাদ ভাঙছে, হৃদয়ের ভিতর ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে ভরসার শেষ রশ্মি। তবু গরু বিক্রি করতেই হবে। ঋণ শোধ করতে হবে। এই দায়িত্ব নিয়েই সে হাজির হয় হাটে।
কিন্তু ৪ জুন সকালেও গরুগুলোর ক্রেতা মেলেনি। যারা আসে, তারা বলে চাহিদার অর্ধেক দাম। হাটে দাঁড়িয়ে থেকে আরিফুল যখন এই কথা বলছিল, তখনও চোখে-মুখে বাবার রক্তভেজা স্মৃতি।
"আমি গাড়ি থাইকা লাফ দিয়া নামলাম। ইশারায় এক ড্রাইভারের কাছে পানি চাইলাম। আব্বার মাথায় পানি দিলাম। ডাক দিলাম—আব্বা কথা কন। আব্বা কোনো কথা কয় না। এমনি করে (হাত জোড় করে) চইলা গেলেন।"
নদীভাঙনের মানুষ, লোকসানের গরু
কোহিনূর শেখ ছিলেন নিবন্ধিত জেলে। পদ্মা নদীতে মাছ ধরে আর কৃষিকাজ করে জীবন চলত। বছর দশেক ধরে ঈদের আগে তিন-চারটি গরু পালন করতেন বিক্রির জন্য। এবারও তাই করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্য তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দেয়।
ভাগনে রেজাউল করিম জানালেন, কোহিনূর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দেরিতে টাকা দেওয়ার ঝামেলা এড়াতে সরাসরি ঢাকায় আসতেন। কারণ, স্থানীয় ব্যাপারীরা মাঝে মাঝে পুরো টাকা দিতেন না, লোকসানের অজুহাতে কাটাকাটি করতেন। অনেক সময় সালিশ দরবারও করতে হতো। তাই গরুর সঙ্গে নিজেই আসতেন ঢাকায়।
এবারও এসেছিলেন। আর ফিরে যেতে পারলেন না।
আরিফুল একা, সংসার অনিশ্চিত
কোহিনূরের স্ত্রী–সন্তানরা এখন চরম অনিশ্চয়তায়। বড় দুই মেয়ে বিবাহিত। বাড়িটা কোনোভাবে টিকে আছে, কিন্তু নদীভাঙনের মুখে। তাদের আবাদি ছয়-সাত বিঘা জমি বহু আগেই পদ্মায় বিলীন হয়েছে। এবার যেটুকু বর্গা জমি নিয়ে পেঁয়াজ চাষ করেছিলেন, তাতেও লোকসান। তিন লাখ টাকার ঋণ মাথায়।
আরিফুল এখন শুধু ছাত্র নয়, পরিবারের ভরসাও। কিন্তু এত বড় দায়িত্বের ভার তার কাঁধ সইবে কিভাবে?
বোন আমেনা খাতুন বললেন, “ভাইডা আমার নিঃস্ব, এতিম হইয়া গেল। মায়ের গলা কানতে কানতে ভাইঙা গেছে। গলা দিয়া আওয়াজ বাইর হয় না।”
এই গল্প কার?
এই গল্প শুধু একটি পরিবারের নয়। এটি হাজারো গ্রামীণ পরিবারের প্রতিচ্ছবি, যারা নদীভাঙন, ঋণ আর অভাবের সঙ্গে প্রতিদিন লড়ছে। যারা জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে হাতে কিছু না থাকলেও, বুকের গভীরে একটা স্বপ্ন নিয়ে—একদিন উঠবে, দাঁড়াবে, আবার চলবে।
এই গল্প আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, নীতিনির্ধারকদের কানে পৌঁছানো দরকার। কারণ আরিফুল শুধু একজন কিশোর না, সে একটি ভাঙা পরিবারের আশার নাম।
এই নিউজ লেখার সময় জানা গেল আরিফুলের তিনটি গরু বিক্রি হয়ে গেছে।

কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন