বিদেশি মিষ্টি আঙুর চাষে সাড়া ফেলেছেন যশোরের জিয়াউর রহমান
বিদেশি মিষ্টি আঙুর চাষে সাড়া ফেলেছেন যশোরের জিয়াউর রহমান
যশোরের মণিরামপুর উপজেলার হেলাঞ্চি গ্রামের কৃষক জিয়াউর রহমান এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ইউটিউব থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণায় বিদেশি মিষ্টি আঙুর চাষ শুরু করে তিনি পেয়েছেন বিস্ময়কর সাফল্য। তার বাগানে এখন শোভা পাচ্ছে এ্যাকুলু, বাইকুনুর, ব্ল্যাক ম্যাজিক, সিলভা, ডিকসন, মার্সেল ফোর্স ও অস্ট্রেলিয়ান — এই সাত জাতের আঙুর।
বাণিজ্যিকভাবে তিনি আঙুরের যে দুই জাত চাষ করছেন— তা হলো এ্যাকুলু ও বাইকুনুর। ৪২ শতক জমিতে সিমেন্টের খুঁটির ওপর বাঁশ ও বিশেষ জাল বিছিয়ে তৈরি মাচায় ছড়িয়ে রয়েছে সবুজ আঙুরলতা, আর পাতার ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে রঙিন আঙুরের থোকা। মুগ্ধ করছে দর্শনার্থীদের দৃষ্টিও মন।
জিয়াউর বলেন, “আমার স্বপ্ন ছিল বিদেশি ফলের বাগান করার। কুল, পেয়ারা ও মাল্টা চাষের পর এবার মনোনিবেশ করি আঙুরে। একবার ফল এলেও টক হওয়ায় হতাশ হয়েছিলাম। কিন্তু হাল ছাড়িনি। ইউটিউব দেখে খুঁজে পাই নতুন মিষ্টি জাতের চারা, এবং এবার ফলন যেমন হয়েছে প্রচুর, স্বাদও হয়েছে অসাধারণ।”
২০২৪ সালের আগস্টে রোপণ করা গাছগুলো মাত্র ১০ মাসের ব্যবধানে ফল দিয়েছে। ফল এতটাই মিষ্টি হয়েছে যে, ক্ষেত থেকেই প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫০০ টাকা দরে। স্থানীয় বাজার ও যশোর শহরের ব্যবসায়ীদের কাছেও সরবরাহ চলছে। পাশাপাশি চারার চাহিদাও বাড়ছে— যা বিক্রি হচ্ছে প্রতি পিস ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায়।
এই বাগান গড়তে জিয়াউরের খরচ হয়েছে আনুমানিক পাঁচ লাখ টাকা। তিনি আশাবাদী, এ মৌসুমেই খরচ উঠে আসবে, এবং কিছুটা লাভও হবে। তার মতে, “একটি আঙুর গাছ গড়ে ৩৬ বছর ফল দিতে পারে। একবার সঠিকভাবে সেট আপ করতে পারলে দীর্ঘ মেয়াদে স্বল্প খরচে মুনাফা সম্ভব।”
তার এই সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। প্রতিদিনই মানুষ ছুটে আসছে হেলাঞ্চি গ্রামে আঙুরের বাগান দেখতে। কেউ কিনছেন আঙুর, কেউ চারা। দর্শনার্থীদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের জমিতে এমন বাগান গড়ার কথা ভাবছেন।
গয়ড়া গ্রামের জুলফিকার আলী বলেন, “এমন বাগান আমি আগে দেখিনি। এটি দেখে আমিও উৎসাহিত হয়েছি। আজ চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছি— নিজেও চাষ করবো।” অপর দর্শনার্থী জাহিদ হোসেন বলেন, “পাকা আঙুর খেয়েছি। এতটাই মিষ্টি যে, বিদেশি আঙুরের সঙ্গে কোনো পার্থক্য নেই। বরং কেমিক্যাল মুক্ত হওয়ায় এটা আরও স্বাস্থ্যকর।”
দেশে ব্যাপক হারে আঙুর উৎপাদন হলে বিদেশি আঙুরের আমদানি কমবে— এমনটাই মনে করেন জাহিদ। তার মতে, “দেশের ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে এই ফল অবিক্রীত থাকবে না, যদি চাষিরা সঠিক পরামর্শ ও সহায়তা পান।”
এ বিষয়ে যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক প্রতাপ মণ্ডল বলেন, “যশোরে আঙুর চাষ এখন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। জেলার আট উপজেলার মধ্যে ছয়টিতে প্রায় আড়াই হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে। আমরা চাষিদের পাশে আছি। তারা যদি সফল হয়, তাহলে শুধু চাহিদা মেটানোই নয়, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পথও খুলে যাবে।”
আঙুর বাগানে জিয়াউরের সাফল্য শুধু তার নিজের জীবনের দিগন্তই উন্মোচন করেনি, বরং দেশের কৃষি অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন